Published On: Sat, Aug 18th, 2012

দারিদ্র্য বিমোচনে ভারসাম্যপূর্ণ মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠায় যাকাত

আ ব ম খোরশিদ আলম খান :
দারিদ্র্য বিমোচনে ভারসাম্যপূর্ণ মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠায় ইসলামের অর্থনৈতিক কর্মসূচি যাকাত। মাহে রমজানে জাকাত আদায় করতে হবে এমন সুনির্দিষ্ট তাগাদা ইসলামে না থাকলেও এ মাসে অধিক পুণ্যের ও ফজিলতের আশায় সামর্থ্যবান রোজাদাররা রোজার দিনে জাকাত আদায়ে সচেষ্ট হন। এ মাসে একটি ভালো কাজের সওয়াব বা প্রতিদান যেহেতু সত্তর গুণ পর্যন্ত বর্ধিত হয়ে আল্লাহর করুণাপ্রাপ্তি নিশ্চিত হয়Ñ তাই রমজান মাসে জাকাত প্রদানের প্রচলিত নিয়মটি অবশ্যই যৌক্তিক ও ইতিবাচক। পবিত্র কুরআনে নানা প্রসঙ্গে বিভিন্নভাবে প্রায় পৌনে একশ বার নামাজের সঙ্গে সঙ্গে জাকাত প্রদানের জোর নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। ‘আক্বীমুস সালাত ওয়াতুজ জাকাত’Ñ তোমরা নামাজ কায়েম করো এবং জাকাত আদায় করো। নামাজের মতোই জাকাত প্রদান বাধ্যতামূলক ফরজ ইবাদতরূপে সাব্যস্ত করা হয়েছে। নামাজ যেভাবে নিজ উদ্যোগে নিজের উপকারের জন্য আল্লাহর নির্দেশ হিসেবে ফরজজ্ঞানরূপে মানুষ আদায় করে ঠিক অনুরূপভাবে জাকাত যার ওপর ফরজ হয়েছে সে নিজ তাগিদে স্বউদ্যোগী হয়েই কর্তব্য পালনে সচেষ্ট হবে এই তো ইসলামের দিকনির্দেশনা। গরিবের দিকে চেয়ে রমজানে জাকাত বিতরণ যথার্থ ও প্রাসঙ্গিক। যেহেতু গরিব দুস্থ মানুষরাও এ মাসে রোজা-ঈদ উদযাপনে শামিল হতে চায়। যদিও এদের আর্থিক সঙ্গতি ও সচ্ছলতা নেই। তাই গরিবরা যাতে রোজার মাসটি নিশ্চিন্তে শান্তিতে সচ্ছলতার সঙ্গে খেয়ে-পরে পার করতে পারেÑ এ জন্য রোজার শুরুর দিকে হিসাব করে ধনীদের জাকাত প্রদানে মনোনিবেশ করতে হবে। দেরিতে জাকাত দেয়া মানে গরিবকে কষ্টে রাখা, তাদের অস্থিরতা-অসহায়ত্ব দেখেও চুপ থাকা। এটা অমানবিক। এ কারণেই রোজার শেষের দিকে জাকাত বিতরণের যে রীতি তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। জাকাত সঠিকভাবে প্রদান ধনীদের ওপর ধর্মীয় ফরজ কর্তব্য হলেও এদিকে অনেক ধনীর দৃষ্টিপাত নেই। ঠিকভাবে জাকাত বিতরণে আগ্রহ ও সহানুভূতি যতোটা থাকা দরকার ততোটা চোখে পড়ে না। এটা দুর্ভাগ্যজনক। ঐশী দায়িত্ব পালনে উদাসীনতা প্রদর্শন দুঃখজনক। ধনীদের মধ্যে জাকাত বিতরণের নিষ্ঠুর পদ্ধতি দেখতে দেখতে বিরক্ত গরিবরা। মাহে রমজান এলে জাকাত পাওয়ার আনন্দের মাঝেও গরিবদের অনেকেই ভয়ে শঙ্কায় থাকেন। না জানি জাকাত নিতে গিয়ে প্রাণটুকু বিসর্জন দিতে হয়Ñ এ জন্যই যতো শঙ্কা। জাকাত গ্রহণের যুদ্ধে নেমে প্রতি বছর বহু লোকের প্রাণহানি ও হতাহতের খবর রমজানের শেষ দিনগুলোতে সংবাদপত্রে অহরহ চোখে পড়ে। বিগত দিনে এ ধরনের মর্মান্তিক খবর দেখে সবাই বিচলিত ও ক্ষুব্ধ হলেও কিভাবে জাকাতের নামে গরিবদের জন্য মৃত্যুফাঁদ পাতা বন্ধ করা যায় তা সরকার বা বিত্তবান কোনো পক্ষই ভাববার গরজবোধ করছে না। জাকাতদাতাদের উদাসীনতা ও প্রদর্শনীর যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে বছর বছর গরিব লোকগুলোর জীবন বিপন্ন হওয়া সত্ত্বেও এ ব্যাপারে কারো মাথাব্যথা আছে বলে মনে হয় না। ভাবখানা এমন, গরিবরা মরবে বাঁচবে তাতে কী আসে যায়! ওরা তো নিম্নশ্রেণীর মানুষ। তাদের নিয়ে এতো ভাবতে হবে কেন? গরিব জনগোষ্ঠীর প্রতি এই যে উপহাস ও তাচ্ছিল্য প্রদর্শন তা কতো অমানবিক ও নৃশংসতার পরিচয় কখনো ওরা ভেবে দেখেছেন কী? মহানবী (দ) বলেছেন, ‘আযজাকাতু কিনতারাতুল ইসলাম’ জাকাত ইসলামের সেতুবন্ধন। জাকাত আদায়ের দ্বারা বিত্তবানরা নিঃস্ব মানুষের কাছাকাছি অবস্থান তৈরি করে। পরস্পর ভালোবাসা ও সম্প্রীতি জাগ্রত হয় জাকাতের মাধ্যমে। অথচ আমরা চারপাশে যা দেখছি তা হাদিসের শিক্ষার সঙ্গে মোটেই সঙ্গতিপূর্ণ নয়। কুরআন মজিদের সুরা তাওবার ১১ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে- ‘ওয়াতুজ জাকাত ফাইখওয়ানুকুম ফিদদ্বীন’Ñ ওরা জাকাত দেয়ার নীতি গ্রহণ করলে ওরা তোমাদের দ্বীনি ভাই হয়ে যাবে। এখানে বলা হয়েছে জাকাত আদায় ও গ্রহণের মাধ্যমে ধনী-গরিবের দূরত্ব ঘুচে গিয়ে ভ্রাতৃত্ববোধ গড়ে ওঠে। কিন্তু বাস্তবে তার উল্টো ঘটছে। জাকাত দেয়ার ঘোষণা মাইকে প্রচার করে হাজারো অভাবী মানুষকে ঘরের আঙিনায় জড়ো করে ওদের মধ্যে ঠেলাঠেলি মারামারি লাগিয়ে দেয়ার বন্দোবস্ত করে ভ্রাতৃত্ববোধ প্রতিষ্ঠার সবক কতোটুকু পালন করা হচ্ছে তাই আজ ভেবে দেখার বিষয়।

এই ফরজ কাজ আদায়ে বিত্তবানদের বাহাদুরি অপ্রত্যাশিত। প্রদর্শনীর চিন্তা বাদ দিয়ে যথাযথভাবে জাকাত আদায়ে ধনীরা সচেষ্ট হবে এটাই ধর্মীয় নির্দেশনা। নামাজ আদায়ের মাধ্যমে দুনিয়ার কাউকে সন্তুষ্ট করবে বা প্রশংসিত হবে এই প্রবণতা নামাজের ক্ষেত্রে না থাকলেও নামাজের মতোই আরেকটি ফরজ ইবাদত জাকাত আদায় করতে গিয়ে আত্মম্ভরিতা বা লৌকিকতা প্রদর্শন মোটেই ইসলামের শিক্ষা নয়। নামাজের আজান শুনে নামাজি নিজ উদ্যোগেই মসজিদে ছুটে যায় নামাজ আদায়ের উদ্দেশে। অথচ যার ওপর জাকাত দেয়া ফরজ হলো সে জাকাত আদায়ে মোটেই তৎপর নয়, উদ্যোগী নয়Ñ তাতো আল্লাহর আদেশের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন, জঘন্য পাপ। ইচ্ছাকৃত নামাজ পরিত্যাগ করার দায়ে যেমন আল্লাহর নির্ধারিত শাস্তির মুখোমুখি হতে হবেÑ জাকাত আদায়ে গড়িমসি বা অবহেলা করলে তাতেও রেহাই মিলবে না। নিজের নামাজ অন্যকে দিয়ে আদায় করা যায় না, নিজেকেই পড়ে নিতে হয়। জাকাতের ক্ষেত্রেও একই হুকুম প্রযোজ্য। জাকাত ফরজ হলে নিজে উদ্যোগী ও তৎপর হয়ে গরিব ও হকদার খুঁজে খুঁজে জাকাত প্রদানে মনোনিবেশ করতে হবে। কোনো অবস্থায় গরিবদের ডেকে নিজের আশপাশে ঘুরঘুর করতে বাধ্য করা যাবে না। ঢাকঢোল পিটিয়ে জাকাত বণ্টনের প্রশ্নই তো আসে না। এভাবে জাকাত দেয়ার ফলে অভাবী লোকদের হুড়োহুড়িতে মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটছে প্রতি বছর। মনে রাখতে হবে জাকাত প্রদর্শনীর বিষয় নয়; আল্লাহর হুকুম। গরিবের প্রতি ধনীদের নিছক দয়া বা করুণা নয়Ñ এটা গরিবের প্রাপ্য অধিকার। গরিবের অধিকার ফিরিয়ে দিয়ে অর্জিত ধন সম্পদ পবিত্র ও বৃদ্ধির সুযোগ ধনীদেরই লুফে নিতে হবে। কেননা আল্লাহপাক ঘোষণা করেছেনÑ ‘ওয়াফি আমওয়ালিহিম হক্কুল লিস্সায়িলি ওয়াল মাহরুম’ (সুরা জারিয়াত-১৯) অর্থাৎ ধনীদের ধন সম্পদে সুনির্দিষ্ট ও সুপ্রতিষ্ঠিত হক বা অধিকার রয়েছে প্রার্থী ও বঞ্চিত লোকের জন্য। তাই গরিবের প্রাপ্য অধিকার সসম্মানেই তাকে গচ্ছিত করে দেয়া সবার কর্তব্য। তাদের অহেতুক হয়রানি করা ও জাকাত বণ্টনের কথা বলে মৃত্যুফাঁদে পেতে রাখা কোনোভাবেই সমীচীন নয়। পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ও সুবিধা সৃষ্টি না করে চলমান জাকাত বণ্টন প্রথা এখনই থামাতে হবে।

মসজিদে মসজিদে ইমাম-খতিব সাহেবরা জাকাত প্রদানে উদ্বুদ্ধ করে বক্তব্য দেবেন, প্রচলিত জাকাত প্রদানের রীতির বিরুদ্ধে জনসচেতনতা গড়ার তাগিদ দেবেন এ বিনীত প্রত্যাশা তাদের প্রতি। সপ্তাহে জুমার দিনে মানুষের বড় সম্মিলনে ইসলামের গণমুখী আদেশ-নির্দেশনা গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরা হলে বহু বিষয়ে প্রত্যাশিত সমাধান বেরিয়ে আসতে পারে। ধর্মপ্রাণ মানুষকে সঠিক ধর্মাচারে ও কর্তব্যনিষ্ঠ জীবনের পথে ধাবিত করতে মসজিদগুলোকে সংশোধন কেন্দ্রের আদলে গড়ে তুলতে হবে। ইমাম-খতিবদের এ ক্ষেত্রে দায়িত্বনিষ্ঠ ভূমিকা রাখতে হবে। না হয় ধর্মাচারের নামে বিকৃতি, বিভ্রান্তি বাড়তেই থাকবে।
আ ব ম খোরশিদ আলম খান : নির্বাহী পরিচালক, ইসলামী গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশ।দারিদ্র্য বিমোচনে জাকাত
আ ব ম খোরশিদ আলম খান
দারিদ্র্য বিমোচনে ভারসাম্যপূর্ণ মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠায় ইসলামের অর্থনৈতিক কর্মসূচি জাকাত। মাহে রমজানে জাকাত আদায় করতে হবে এমন সুনির্দিষ্ট তাগাদা ইসলামে না থাকলেও এ মাসে অধিক পুণ্যের ও ফজিলতের আশায় সামর্থ্যবান রোজাদাররা রোজার দিনে জাকাত আদায়ে সচেষ্ট হন। এ মাসে একটি ভালো কাজের সওয়াব বা প্রতিদান যেহেতু সত্তর গুণ পর্যন্ত বর্ধিত হয়ে আল্লাহর করুণাপ্রাপ্তি নিশ্চিত হয়Ñ তাই রমজান মাসে জাকাত প্রদানের প্রচলিত নিয়মটি অবশ্যই যৌক্তিক ও ইতিবাচক। পবিত্র কুরআনে নানা প্রসঙ্গে বিভিন্নভাবে প্রায় পৌনে একশ বার নামাজের সঙ্গে সঙ্গে জাকাত প্রদানের জোর নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। ‘আক্বীমুস সালাত ওয়াতুজ জাকাত’Ñ তোমরা নামাজ কায়েম করো এবং জাকাত আদায় করো। নামাজের মতোই জাকাত প্রদান বাধ্যতামূলক ফরজ ইবাদতরূপে সাব্যস্ত করা হয়েছে। নামাজ যেভাবে নিজ উদ্যোগে নিজের উপকারের জন্য আল্লাহর নির্দেশ হিসেবে ফরজজ্ঞানরূপে মানুষ আদায় করে ঠিক অনুরূপভাবে জাকাত যার ওপর ফরজ হয়েছে সে নিজ তাগিদে স্বউদ্যোগী হয়েই কর্তব্য পালনে সচেষ্ট হবে এই তো ইসলামের দিকনির্দেশনা। গরিবের দিকে চেয়ে রমজানে জাকাত বিতরণ যথার্থ ও প্রাসঙ্গিক। যেহেতু গরিব দুস্থ মানুষরাও এ মাসে রোজা-ঈদ উদযাপনে শামিল হতে চায়। যদিও এদের আর্থিক সঙ্গতি ও সচ্ছলতা নেই। তাই গরিবরা যাতে রোজার মাসটি নিশ্চিন্তে শান্তিতে সচ্ছলতার সঙ্গে খেয়ে-পরে পার করতে পারেÑ এ জন্য রোজার শুরুর দিকে হিসাব করে ধনীদের জাকাত প্রদানে মনোনিবেশ করতে হবে। দেরিতে জাকাত দেয়া মানে গরিবকে কষ্টে রাখা, তাদের অস্থিরতা-অসহায়ত্ব দেখেও চুপ থাকা। এটা অমানবিক। এ কারণেই রোজার শেষের দিকে জাকাত বিতরণের যে রীতি তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। জাকাত সঠিকভাবে প্রদান ধনীদের ওপর ধর্মীয় ফরজ কর্তব্য হলেও এদিকে অনেক ধনীর দৃষ্টিপাত নেই। ঠিকভাবে জাকাত বিতরণে আগ্রহ ও সহানুভূতি যতোটা থাকা দরকার ততোটা চোখে পড়ে না। এটা দুর্ভাগ্যজনক। ঐশী দায়িত্ব পালনে উদাসীনতা প্রদর্শন দুঃখজনক। ধনীদের মধ্যে জাকাত বিতরণের নিষ্ঠুর পদ্ধতি দেখতে দেখতে বিরক্ত গরিবরা। মাহে রমজান এলে জাকাত পাওয়ার আনন্দের মাঝেও গরিবদের অনেকেই ভয়ে শঙ্কায় থাকেন। না জানি জাকাত নিতে গিয়ে প্রাণটুকু বিসর্জন দিতে হয়Ñ এ জন্যই যতো শঙ্কা। জাকাত গ্রহণের যুদ্ধে নেমে প্রতি বছর বহু লোকের প্রাণহানি ও হতাহতের খবর রমজানের শেষ দিনগুলোতে সংবাদপত্রে অহরহ চোখে পড়ে। বিগত দিনে এ ধরনের মর্মান্তিক খবর দেখে সবাই বিচলিত ও ক্ষুব্ধ হলেও কিভাবে জাকাতের নামে গরিবদের জন্য মৃত্যুফাঁদ পাতা বন্ধ করা যায় তা সরকার বা বিত্তবান কোনো পক্ষই ভাববার গরজবোধ করছে না। জাকাতদাতাদের উদাসীনতা ও প্রদর্শনীর যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে বছর বছর গরিব লোকগুলোর জীবন বিপন্ন হওয়া সত্ত্বেও এ ব্যাপারে কারো মাথাব্যথা আছে বলে মনে হয় না। ভাবখানা এমন, গরিবরা মরবে বাঁচবে তাতে কী আসে যায়! ওরা তো নিম্নশ্রেণীর মানুষ। তাদের নিয়ে এতো ভাবতে হবে কেন? গরিব জনগোষ্ঠীর প্রতি এই যে উপহাস ও তাচ্ছিল্য প্রদর্শন তা কতো অমানবিক ও নৃশংসতার পরিচয় কখনো ওরা ভেবে দেখেছেন কী? মহানবী (দ) বলেছেন, ‘আযজাকাতু কিনতারাতুল ইসলাম’ জাকাত ইসলামের সেতুবন্ধন। জাকাত আদায়ের দ্বারা বিত্তবানরা নিঃস্ব মানুষের কাছাকাছি অবস্থান তৈরি করে। পরস্পর ভালোবাসা ও সম্প্রীতি জাগ্রত হয় জাকাতের মাধ্যমে। অথচ আমরা চারপাশে যা দেখছি তা হাদিসের শিক্ষার সঙ্গে মোটেই সঙ্গতিপূর্ণ নয়। কুরআন মজিদের সুরা তাওবার ১১ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে- ‘ওয়াতুজ জাকাত ফাইখওয়ানুকুম ফিদদ্বীন’Ñ ওরা জাকাত দেয়ার নীতি গ্রহণ করলে ওরা তোমাদের দ্বীনি ভাই হয়ে যাবে। এখানে বলা হয়েছে জাকাত আদায় ও গ্রহণের মাধ্যমে ধনী-গরিবের দূরত্ব ঘুচে গিয়ে ভ্রাতৃত্ববোধ গড়ে ওঠে। কিন্তু বাস্তবে তার উল্টো ঘটছে। জাকাত দেয়ার ঘোষণা মাইকে প্রচার করে হাজারো অভাবী মানুষকে ঘরের আঙিনায় জড়ো করে ওদের মধ্যে ঠেলাঠেলি মারামারি লাগিয়ে দেয়ার বন্দোবস্ত করে ভ্রাতৃত্ববোধ প্রতিষ্ঠার সবক কতোটুকু পালন করা হচ্ছে তাই আজ ভেবে দেখার বিষয়।

এই ফরজ কাজ আদায়ে বিত্তবানদের বাহাদুরি অপ্রত্যাশিত। প্রদর্শনীর চিন্তা বাদ দিয়ে যথাযথভাবে জাকাত আদায়ে ধনীরা সচেষ্ট হবে এটাই ধর্মীয় নির্দেশনা। নামাজ আদায়ের মাধ্যমে দুনিয়ার কাউকে সন্তুষ্ট করবে বা প্রশংসিত হবে এই প্রবণতা নামাজের ক্ষেত্রে না থাকলেও নামাজের মতোই আরেকটি ফরজ ইবাদত জাকাত আদায় করতে গিয়ে আত্মম্ভরিতা বা লৌকিকতা প্রদর্শন মোটেই ইসলামের শিক্ষা নয়। নামাজের আজান শুনে নামাজি নিজ উদ্যোগেই মসজিদে ছুটে যায় নামাজ আদায়ের উদ্দেশে। অথচ যার ওপর জাকাত দেয়া ফরজ হলো সে জাকাত আদায়ে মোটেই তৎপর নয়, উদ্যোগী নয়Ñ তাতো আল্লাহর আদেশের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন, জঘন্য পাপ। ইচ্ছাকৃত নামাজ পরিত্যাগ করার দায়ে যেমন আল্লাহর নির্ধারিত শাস্তির মুখোমুখি হতে হবেÑ জাকাত আদায়ে গড়িমসি বা অবহেলা করলে তাতেও রেহাই মিলবে না। নিজের নামাজ অন্যকে দিয়ে আদায় করা যায় না, নিজেকেই পড়ে নিতে হয়। জাকাতের ক্ষেত্রেও একই হুকুম প্রযোজ্য। জাকাত ফরজ হলে নিজে উদ্যোগী ও তৎপর হয়ে গরিব ও হকদার খুঁজে খুঁজে জাকাত প্রদানে মনোনিবেশ করতে হবে। কোনো অবস্থায় গরিবদের ডেকে নিজের আশপাশে ঘুরঘুর করতে বাধ্য করা যাবে না। ঢাকঢোল পিটিয়ে জাকাত বণ্টনের প্রশ্নই তো আসে না। এভাবে জাকাত দেয়ার ফলে অভাবী লোকদের হুড়োহুড়িতে মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটছে প্রতি বছর। মনে রাখতে হবে জাকাত প্রদর্শনীর বিষয় নয়; আল্লাহর হুকুম। গরিবের প্রতি ধনীদের নিছক দয়া বা করুণা নয়Ñ এটা গরিবের প্রাপ্য অধিকার। গরিবের অধিকার ফিরিয়ে দিয়ে অর্জিত ধন সম্পদ পবিত্র ও বৃদ্ধির সুযোগ ধনীদেরই লুফে নিতে হবে। কেননা আল্লাহপাক ঘোষণা করেছেনÑ ‘ওয়াফি আমওয়ালিহিম হক্কুল লিস্সায়িলি ওয়াল মাহরুম’ (সুরা জারিয়াত-১৯) অর্থাৎ ধনীদের ধন সম্পদে সুনির্দিষ্ট ও সুপ্রতিষ্ঠিত হক বা অধিকার রয়েছে প্রার্থী ও বঞ্চিত লোকের জন্য। তাই গরিবের প্রাপ্য অধিকার সসম্মানেই তাকে গচ্ছিত করে দেয়া সবার কর্তব্য। তাদের অহেতুক হয়রানি করা ও জাকাত বণ্টনের কথা বলে মৃত্যুফাঁদে পেতে রাখা কোনোভাবেই সমীচীন নয়। পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ও সুবিধা সৃষ্টি না করে চলমান জাকাত বণ্টন প্রথা এখনই থামাতে হবে।
মসজিদে মসজিদে ইমাম-খতিব সাহেবরা জাকাত প্রদানে উদ্বুদ্ধ করে বক্তব্য দেবেন, প্রচলিত জাকাত প্রদানের রীতির বিরুদ্ধে জনসচেতনতা গড়ার তাগিদ দেবেন এ বিনীত প্রত্যাশা তাদের প্রতি। সপ্তাহে জুমার দিনে মানুষের বড় সম্মিলনে ইসলামের গণমুখী আদেশ-নির্দেশনা গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরা হলে বহু বিষয়ে প্রত্যাশিত সমাধান বেরিয়ে আসতে পারে। ধর্মপ্রাণ মানুষকে সঠিক ধর্মাচারে ও কর্তব্যনিষ্ঠ জীবনের পথে ধাবিত করতে মসজিদগুলোকে সংশোধন কেন্দ্রের আদলে গড়ে তুলতে হবে। ইমাম-খতিবদের এ ক্ষেত্রে দায়িত্বনিষ্ঠ ভূমিকা রাখতে হবে। না হয় ধর্মাচারের নামে বিকৃতি, বিভ্রান্তি বাড়তেই থাকবে।
আ ব ম খোরশিদ আলম খান : নির্বাহী পরিচালক, ইসলামী গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশ।

Leave a comment

XHTML: You can use these html tags: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <strike> <strong>

ঢাকা সময়

অনলাইন জরিপঃ

'৫ মে শাপলা চত্বরে পুলিশ অপারেশেন না চালালে বাংলাদেশের অস্তিত্ব থাকত না' দাবি এইচটি ইমামের। আপনি কি তাই মনে করেন?

View Results

Loading ... Loading ...

সম্পাদক ও প্রকাশকঃ আহমাদ আলী
বার্তা প্রধানঃ রিদওয়ান আহমেদ
চীফ রিপোর্টারঃ মহিউদ্দিন আহমেদ
৮নং ডি.আই.টি এভিনিউ, মঞ্জুরী ভবন (৭ম তলা), মতিঝিল বা/এ, ঢাকা-১০০০
মুঠোফোন : ০১৭১৭-১৮১৬৭২, ০১৭১৫-০৯৩৮৬৫, ফোন-ফ্যাক্স : ০২-৯৫৫৪১৭৩
ই-মেইল : ridwanahmed92@ymail.com